Skip to content

তৃতীয় একক: লিঙ্গ, ক্ষমতা ও শিক্ষা ​

কোর্স

কোর্স-VI (1.4.6) — লিঙ্গ, বিদ্যালয় ও সমাজ

পরিবারে লিঙ্গ পরিচয় ও সামাজিকীকরণ ​

সামাজিকীকরণ হল সেই আজীবন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজের প্রত্যাশিত রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও আচরণ শিখে নেয়। পরিবার হল সামাজিকীকরণের প্রধান মাধ্যম। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই পরিবার তার লিঙ্গ পরিচয় গঠন করতে শুরু করে। শিশুকে যে পোশাক পরানো হয়, যে খেলনা দেওয়া হয় এবং যে গৃহকর্ম বরাদ্দ করা হয়—সব কিছুর মধ্য দিয়েই এই প্রক্রিয়া ঘটে। পরিবার অজান্তেই শিশুদের শিখিয়ে দেয় ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে তাদের কী ভূমিকা পালন করতে হবে। ছেলেদের প্রায়শই শেখানো হয় শক্তিশালী, স্বাধীন ও আবেগ-সংযত হতে, অন্যদিকে মেয়েদের শেখানো হয় পরিচর্যাশীল, সমন্বয়প্রবণ এবং গার্হস্থ্য দায়িত্বকেন্দ্রিক হতে।

উদাহরণ

একটি সাধারণ পরিবারে অতিথি এলে কিশোরী কন্যাকে সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরে গিয়ে চা তৈরি ও জলখাবার পরিবেশনের কাজে হাত দিতে হয়। অন্যদিকে তার কিশোর ভাই বসার ঘরে বসে বড়দের আলোচনায় যোগ দিতে পারে। এভাবে নীরবে উভয় শিশুই শেখে যে নারীর পরিসর হল সেবা, আর পুরুষের পরিসর হল সামাজিক অংশগ্রহণ।

শিক্ষকের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ: শিশুর পারিবারিক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা থাকলে শিক্ষক বুঝতে পারেন কেন কোনো শিক্ষার্থী কথা বলতে বা নির্দিষ্ট কাজে অংশ নিতে দ্বিধা করে; তখন তিনি ধৈর্য ধরে ও কোমলভাবে তাকে সেই সীমা ভাঙতে উৎসাহ দিতে পারেন।

বিদ্যালয়ে লিঙ্গ পরিচয় ও সামাজিকীকরণ ​

বিদ্যালয় সামাজিকীকরণের গৌণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বিদ্যালয়ের একটি আনুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম থাকে, পাশাপাশি থাকে একটি "গুপ্ত পাঠ্যক্রম"। গুপ্ত পাঠ্যক্রম বলতে বোঝায় সেই অলিখিত নিয়মাবলি, শিক্ষকের প্রত্যাশা এবং সূক্ষ্ম পক্ষপাত, যা শিক্ষার্থীদের কাছে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক রীতিনীতি পৌঁছে দেয়। পাঠ্যবই, বসার বিন্যাস, খেলার মাঠের নিয়ম এবং শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা—সবই এই গুপ্ত পাঠ্যক্রমে অবদান রাখে। বিদ্যালয় হয় পরিবারে শেখা অসম ক্ষমতা-সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে, অথবা সমস্ত শিক্ষার্থীকে সমান ক্ষমতার অধিকারী ও সমান কৃতিত্ব অর্জনের সামর্থ্যসম্পন্ন বিবেচনা করে সক্রিয়ভাবে সেই অসমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

উদাহরণ

একজন শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ পুনর্বিন্যাসের জন্য সাহায্য প্রয়োজন। তিনি দুজন লম্বা ছেলেকে ভারী কাঠের ডেস্ক সরাতে বললেন, আর দুজন মেয়েকে ব্ল্যাকবোর্ড মুছতে ও নোটিশ বোর্ড সাজাতে বললেন। অনিচ্ছাকৃতভাবেই শিক্ষক এই ধারণা আরও দৃঢ় করছেন যে ছেলেরাই শারীরিক পরিশ্রমের জন্য এবং মেয়েরাই সৌন্দর্যমূলক, সূক্ষ্ম কাজের জন্য নির্ধারিত।

শিক্ষকের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ: শিক্ষককে নিজের গুপ্ত পক্ষপাত সম্পর্কে নিয়ত আত্মসমালোচনামূলক থাকতে হবে, যাতে দৈনন্দিন শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি অজান্তে সীমাবদ্ধ কুসংস্কার চাপিয়ে না দেন।

অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সংগঠনে লিঙ্গ পরিচয় ও সামাজিকীকরণ ​

গৃহ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বিস্তৃত সমাজ-পরিবেশ শিশুর লিঙ্গ পরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এটি ঘটে অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের (যেমন সমবয়সী গোষ্ঠী, স্থানীয় পাড়া-ক্লাব এবং গণমাধ্যম) এবং আনুষ্ঠানিক সংগঠনের (যেমন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও বিচারব্যবস্থা) মধ্য দিয়ে। এই সংগঠনগুলি প্রায়শই সমাজের পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামোর প্রতিফলন ঘটায়। সমবয়সী গোষ্ঠী কঠোরভাবে ঠিক করে দেয় ছেলে ও মেয়েদের জন্য কোনটি "আকর্ষণীয়" বা গ্রহণযোগ্য। গণমাধ্যম তরুণ-তরুণীদের উপর পুরুষত্ব ও নারীত্বের আদর্শায়িত ছবি চাপিয়ে দেয়। আনুষ্ঠানিক সংগঠনগুলি প্রায়শই নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্তগ্রহণের ভূমিকা কেবল পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত রাখে, ফলে এই ধারণা আরও জোরালো হয় যে পুরুষরাই স্বাভাবিক নেতা।

উদাহরণ

অনানুষ্ঠানিক: পাড়ার খেলার মাঠে ছেলেরা মাঝখানের মূল অংশটি দখল করে উচ্চস্বরে ও বিস্তৃত পরিসরে ক্রিকেট খেলে, আর মেয়েদের প্রান্তে সরিয়ে দেওয়া হয় আড্ডা দিতে বা ছোটখাটো খেলায় মেতে থাকতে। আনুষ্ঠানিক: অনেক স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কেবল পুরুষদেরই প্রার্থনা পরিচালনা বা প্রধান ধর্মীয় আচার সম্পাদনের অনুমতি থাকে, যা তরুণ পর্যবেক্ষকদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠায় কাদের হাতে আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব রয়েছে।

শিক্ষকের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ: শিক্ষককে এই শক্তিশালী বাহ্যিক প্রভাবগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা গড়ে তুলতে পারেন—যাতে তারা গণমাধ্যম ও সমাজের বার্তাগুলি নিষ্ক্রিয়ভাবে মেনে না নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে।

মেয়েদের বিদ্যালয়শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন ​

ক্ষমতায়ন হল জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যক্তি স্বাধীনভাবে জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে এবং অসমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারে। মেয়ে ও নারীদের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়শিক্ষাই ক্ষমতায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। শিক্ষা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। এটি মেয়েদের সাক্ষরতা দান করে, যা উচ্চশিক্ষার এবং শেষ পর্যন্ত আর্থিক স্বাধীনতার পথ খুলে দেয়। আর্থিকভাবে স্বাধীন নারীরা বাল্যবিবাহ বিলম্বিত করতে পারে, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দাবি করতে পারে এবং রাজনৈতিক তথা পারিবারিক সিদ্ধান্তগ্রহণে অংশ নিতে পারে। বিদ্যালয়শিক্ষা মেয়েটিকে সমাজের নিয়মের নিষ্ক্রিয় গ্রহণকারী থেকে সক্রিয় নাগরিকে রূপান্তরিত করে, যে নিজের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করতে পারে।

উদাহরণ

একটি গ্রামীণ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করে তার আইনি অধিকার ও আর্থিক সাক্ষরতা সম্পর্কে জানতে পারে। এই শিক্ষার ফলেই সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলে এবং নিকটবর্তী শহরে একটি চাকরি পায়, যার ফলে আত্মীয়দের পরিকল্পিত জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ সে প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

শিক্ষকের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ: শিক্ষক কেবল পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করছেন না; তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি মেয়ের ভবিষ্যতের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সমাজে তার স্বরের ভিত্তি তৈরি করছেন।

মূল পরিভাষা ​

  • সামাজিকীকরণ: যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি তার সমাজের রীতিনীতি, নিয়ম ও আচরণ শিখে তা আত্মস্থ করে।
  • গুপ্ত পাঠ্যক্রম: আনুষ্ঠানিক শিক্ষামূলক পাঠের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যে অকথিত, অলিখিত মূল্যবোধ ও প্রত্যাশা শেখে।
  • সমবয়সী গোষ্ঠী: বয়স, সামাজিক পদমর্যাদা ও আগ্রহে সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক দল, যা ব্যক্তির আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
  • ক্ষমতায়ন: আরও সবল ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া, বিশেষত নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা ও নিজের অধিকার দাবি করা।

সংক্ষিপ্ত পুনরালোচনা ​

  • পরিবার অতি অল্প বয়সেই ছেলে ও মেয়েদের জন্য ভিন্ন খেলনা, গৃহকর্ম ও প্রত্যাশা নির্ধারণ করে লিঙ্গ ভূমিকা প্রবর্তন করে।
  • বিদ্যালয় "গুপ্ত পাঠ্যক্রম"-এর মধ্য দিয়ে—শিক্ষকের পক্ষপাত ও শ্রেণিকক্ষের কাজ ভাগাভাগি সহ—লিঙ্গ পরিচয় আরও দৃঢ় করে।
  • অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী (সমবয়সী দল, গণমাধ্যম) এবং আনুষ্ঠানিক সংগঠন (ধর্ম, কর্মক্ষেত্র) নিয়তই সমাজের ক্ষমতা-সম্পর্ক ও লিঙ্গ-ক্রমবিন্যাসের নমুনা উপস্থাপন করে।
  • মেয়েদের বিদ্যালয়শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের সরাসরি চালিকাশক্তি, যা আর্থিক স্বাধীনতা, বিবাহ বিলম্বন এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

অতিরিক্ত পাঠ ​

  • National Focus Group on Gender Issues in Education (Position Paper) — এনসিইআরটি, ২০০৬।
  • Gender, School and Society — সুজাতা সেন।